একজন নন্দিত হুমায়ুন আহমেদ

সুলতানুল আরেফীন আদিত্য || তখন আমি মাদরাসার ছাত্র । মনিপুরের মিরপুরে একটি মাদরাসায় পড়তাম । আমার বন্ধু ছিল মুয়াজ । এখনো আছে তখনো ছিল । ও দেখতাম , প্রায়শই হুমায়ুন আহমেদ , তপন ভট্টাচার্য , তৌহিদুর রহমান , আল মাহমুদ হুমায়ুন আজাদ এদের পুরাতন বই এনে পড়তো । তখনো আমি হুমায়ুনকে চিনিনা । আমি ভাবছি মুয়াজ বাসায় থেকে আনে । ওর বাসা আবার মানিকগঞ্জ ।মনে খটকা লাগলো । আমাদের তো মাসে ছুটি একদিনের । সাপ্তাহিক কোন ছুটি নেই । তাহলে ও কোথেকে আনে ? তখন আমার বই পড়ার অভ্যাস ছিল না । খুব কম । তবে কিশোরকন্ঠ পড়তাম । ২০০৯ সালের কথা , ওরে বললাম , কিরে তুই পুরান বই থেকে আনিস ? ও বললো , তোরে নিয়ে যামুনি । তারপর ওর কাছে একটা বই চেয়ে নিলাম ।হিমু রিমান্ডে অথবা হিমুর আছে জল ঠিক মনে নেই । হিমু সিরিজ দিয়ে শুরু হলো আমার হুমায়ুন পথচলা । মুয়াজ একদিন আমারে নিয়ে গেল , মিরপুর ১০ ফায়ার সার্ভিসের পূর্ব পার্শ্বে । দেখলাম বেশ কয়েকটা বইয়ের দোকান । একটা দোকান ব্যতিত সবগুলাই পুরাতন বইয়ের সমাহার । দাম গায়ের মূল্যে থেকে অর্ধেক । সব বইয়ে এই অফার থাকলেও হুমায়ুন আহমেদের বইয়ে ৫০% ছিলনা । বইয়ের চাহিদা বেশী থাকায় পুরাতন বইও একটু চড়া দামে বিক্রি করতো ।কিন্ত অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও তার বই কিনতে পারতাম না । ছাত্র মানুষ । থাকি মাদরাসায় । পকেট খরচ করে যে টাকা বাড়তি হতো সেটা দিয়ে বই কিনতাম ।বিভিন্ন সময় প্রচ্ছদ দেখে বিভিন্ন বই কিনতাম , পড়তাম । তখন আমরা যারা মাদরাসায় পড়তাম । আমরা চাইলেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারতাম না । আমাদের বিধি নিষেধ । তবে অনেকেই চুরি করে মোবাইল ব্যবহার করতো । সেই দলে আমিও ছিলাম । রাতের বেলায় বালিশের নিচে ফোন রেখে , বালিশের কাভারে হেড ফোন গুজে দিয়ে এফএম রেডিও শুনতাম । তো একদিন খবরে শুনতে পেলাম , চিকিৎস্যার জন্য আবার নিউইয়র্ক যাচ্ছেন কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ । বিস্তারিত নিউজে শুনলাম , ক্যান্সারের চিকিৎস্যার জন্য নিউইয়র্ক যাচ্ছেন জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ । আজ রাত …,,,,,,, দেশ ছাড়বেন এই লেখক । খবর শোনার পর খুব একটা খারাপও লাগেনি । কত মানুষের ক্যান্সার হচ্ছে আবার ভাল হচ্ছে । বিষয়টা অন্যসব স্বাভাবিক খবরের মতোই লাগছে । এরপর অনেকদিন বইটই পড়া হয়নি । মাদরাসায় সিলেবাসের বাইরে উপন্যাস , কবিতা , গল্পের বই এগুলো পড়া গুরুতর অপরাধ । পড়লেও সেটা চুরি করে পড়তে হতো । এরপর ২০১২ তে জুলাই মাসের ১৩/১৪ তারিখে সম্ভবত রমজানের ছুটিতে বাড়িতে চলে এলাম । তখন আব্বুর ঔষধের দোকান প্লাস প্যাথলজীক্যাল ল্যাব । আমি ছুটির সময়গুলোতে আব্বুকেও সময় দেই । সেদিন আব্বু আর আমি ডিস্পেন্সারীতে বসে আছি । কোন কারনে হকার পত্রিকা দেয়নি । আব্বু বলল , সামনের স্টুডিও থেকে শাহিনের কাছ থেকে পত্রিকাটা আনো । আমাদের দোকানের সামনের দোকানটায় ছিল , বিলাস ডিজিটাল স্টুডিও । সাংবাদিক শাহিন ভাইয়ের । তখন শাহিন ভাইয়ের সাথে আমার হাই হ্যালো সম্পর্ক । শাহিন ভাইয়ের কাছ থেকে ইত্তেফাক পত্রিকাটি নিয়ে পড়তে পড়তে দোকানে ঢুকছি । প্রথম পাতায় দেখলাম , হুমায়ুন আহমেদের সাথে মেহের আফরোজ শাওনের ছবি । তখন হুমায়ুন বই সম্পর্কে কিছুটা জানলেও ব্যক্তি হুমায়ুনকে জানতাম না । আমি এতোটাই বোকা আমি নিউজ না দেখে পত্রিকার ছবির দিকে তাকিয়ে আছি । ভাবছি হুমায়ুন আহমেদের পাশে মেয়েটা কে ? হঠাৎ চোখ পরলো নিউজে , অসময়ে চলে গেলেন হুমায়ুন আহমেদ । ততোক্ষণে আব্বু ধমক দিয়ে পত্রিকা নিয়ে নিল । আমি পুরোপুরি আহত হয়ে গেলাম । মনে হচ্ছে খুব নিকট কাউকে হারিয়েছি । এদিকে পত্রিকা আব্বু পড়ছে । অন্যদিকে তর সহ্য হচ্ছেনা । বাড়িতে তখন কারেন্ট ছিলনা । বাজারে কারেন্ট থাকলেও টিভি ছিলনা । উভয় সংকট । মন খারাপের খবর নেওয়ার মাধ্যম নেই । প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে বসে আছি । কখন আব্বুর পত্রিকা দেখা শেষ হবে ? কখন আমি পড়তে পারবো । ঘনঘন মনে হতে লাগলো , কেন ঢাকা থেকে চলে আসলাম । কাকার বাসায় থেকে গেলে আজ তার জানাজায় অংশ গ্রহন করতে পারতাম । শহীদ মিনারের লম্বা লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা হলুদ পান্জাবী পরে শরীর ঘামাতাম । ঘটনা চক্রে সেই দিন বড় আন্টির বাসায় গেলাম , টিভির সামনে বসে পরলেও বেশীক্ষণ থাকতে পারিনি । টিভিতে বারবার দেখাচ্ছে । সবগুলো চ্যানেল লাইভ দেখাচ্ছে । কত হিমু , কত রূপা , কড়া রোদ উপেক্ষা করে ফুল হাতে দাড়িয়ে আছে । শেষ শ্রদ্ধা টুকুন অর্পণ করবে । তারাও জেনে গেছে , বাংলাদেশের ইতিহাসে এতোটা জনপ্রিয় , এতোটা জননন্দিত কথাসাহিত্যিক দ্বিতীয় কেউ হয়তো আর আসবেনা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here