একজন আ.স.ম. জামশেদ খোন্দকার

সুলতানুল আরেফীন আদিত্য।। বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার । এই মানুষটার সাথে আমার পরিচয় পাঠশালার একটি সমাপনী পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে । সেই অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি । আমি ছিলাম আমন্ত্রিত অতিথি । সেদিন মুগ্ধ হয়ে তার বক্তব্য শুনেছিলাম । তার বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন , জীবনে তিনি প্রচুর আজান দিয়েছেন । ধার্মিক ফ্যামিলিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটার লাইফ স্টাইল ছিল একটু অন্যরকম । মা ভীতু ছেলেটা আজ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ।সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার কোন অবকাশ ছিলনা । সন্ধ্যার নামাজ তাদের উঠানে পরতেন । ত্রিফলা বিছিয়ে । ফ্যামিলির ছোট বড় সবাই সে নামাজে অংশ নিতেন । এই মানুষটার সাথে আমার জীবনেরও বেশ মিল রয়েছে । ছোটবেলা মসজিদে আজান দিতাম । এজীবনে প্রচুর আজান দিয়েছি । আজান প্রতিযোগীতা ছিল আমার জীবনে মধুর একটা অধ্যায় । আমরা ছোট ছোট কয়েকজন ভায়েচারি ছিলাম । আমরা ভাগ করে নিতাম । জোহরের আজান একজন দিলে আছর দিতাম আমি , মাগরিব আরেকজন । দেখা গেছে আমাদের মুয়াজ্জিন আমাদের জ্বালায় আজান ই দিতে পারতোনা । বিভিন্ন সময় হুজুররা বলতো , কাল কিয়ামতের দিন মুয়াজ্জিন মাথা সবার উপরে থাকবে । সবাই বুঝতে পারবে এরা দুনিয়াতে আজান দিত । এদের আহবানে আমরা মসজিদে যেতাম । কারণ , মুয়াজ্জিনরা সবসময় মুক্তাদির । তারা ইত্তাদাইতু বিহাযাল ইমাম । তারা ইমামকে অনুসরণ করে ।ইমাম যদি ভুল করে তা বর্তাবে তার উপর । এসব দিক দিয়ে তার সাথে আমার যথেষ্ঠ মিল ছিল। অথচ এই জেনারেশনে এই প্রতিযোগীতা নেই বললেই চলে । এরজন্য আমি মনে করি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম । করোনাকালে অনেকে অনেক ভাবে মানুষের পাশে দাড়িয়েছে । এই করোনা মানুষ কে যেমন স্যাক্রিফাইস করতে শিখিয়েছে। তেমনি মানুষকে নির্দয় , নির্মম , নিষ্ঠুর হতে শিখিয়েছে । আমি মনে করি করোনা ছিলে মানুষের জন্য একটা প্রেসক্রিপশন । করোনা মানুষকে বেপোরোয়া জীবন থেকে ফিরিয়ে এনেছে । যারা অফিস, কাঁচারী, দলীয় কার্যালয়ে অহেতুক আড্ডা দিত । কোন কাজ নেই । অনিয়ন্ত্রিত জীবনটাকে নিয়ন্ত্রিত এই করোনায় করেছে । এই করোনা ঝড় বকশীগঞ্জবাসীও ফেস করেছে । কঠিন এই সংকট মোকাবেলা বকশীগঞ্জবাসী কম করে নাই । যারা দিনে এনে দিনে খায় তারা বিভিন্ন সময় ত্রাণ সহায়তা পেলেও কঠিন ছিল মধ্যবিত্তদের । যারা চাইলেই হাত পাততে পারতোনা । একজন রিকশাওয়ালা চাইলে কামলা দিতে পারে । সে চাইলেই লেবারগিরি করতে পারে । কিন্ত একজন মধ্যবিত্ত চাইলেই তা করতে পারেনা । কিন্ত এই মধ্যবিত্তদের জন্য হয়তো “গড গিফটেড” ছিলেন বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ.স.ম জামশেদ খোন্দকার । তিনি খবর পাওয়া রাতের আধারে ছুটে যেতেন । খুবই নীরবে , নির্ভৃতে মানুষের পাশে ছায়া হয়ে যেতেন । শুধু তাই নন , ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন , কেউ না খেয়ে থাকলে জানাবেন , নাম পরিচয় গোপন করা হবে । স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তার সাথে কাজ সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল । এজন্য মনির ভাইকে ধন্যবাদ তো দিতেই হয় । খুব কাছ থেকে তার কাউন্টার দেখেছি । আমি মনে করি , বকশীগঞ্জ স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য তার সান্নিধ্যটা ছিল এক চমৎকার অভিজ্ঞতা । তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েছেন নিজ তহবিল থেকে । যাইহোক তাকে এরকম অনেক কথায় ইনিয়ে বিনিয়ে বলা যাবে । এমন অনেক মানবিক কাজের সাক্ষী উনি নিজেই । আমি নিজে যেহেতু ছোটখাটো একটা বিজনেস করি সেই সুবাদে বকশীগঞ্জের বেশ কয়েকটা ব্যবসায়িক সমিতির সাথে আমার সম্পৃক্ততা আছে । বিভিন্ন মিটিংয়ে থাকতে হয় । আমি অবজার্ভ করলাম এই মানুষটার কোন হেটার্স নাই । অথচ বকশীগঞ্জের ব্যবাসায়ীরা এই মানুষটার সাথে চোর পুলিশ খেলেছে । ইউএনউ একদিকে সাইরেন বাজিয়ে দোকান বন্ধ করে যায় আবার , পরক্ষনেই খুলে । এসব দিক বিবেচনা করলে ব্যবসায়ীরা তার প্রতি ক্ষোভ থাকার কথা ! তবুও তিনি প্রিয় , কোন ক্ষোভ নেই , নেই কোন আক্ষেপ । তিনি শুধু জামশেদ খন্দকার বলেই সম্ভব । তারাই বুঝে গেছে এ বেচারা নিজের স্বার্থের জন্য এসব করছে না । আমাদের পরিবার যাতে সংক্রমিত না হয় , বা আমরা যাতে সুস্থ থাকি । এজন্যই তার এহেন প্রয়াস । নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে দায়িত্বের বাইরেও কাজ করে চলছে মানুষটা । এই মানুষটাকে আমি শ্রদ্ধা করি । যদিও সামনাসামনি শ্রদ্ধা করার সুযোগ হয়নি । মনের অজান্তে মানুষটা আমার কিংবা আমাদের প্রিয় বনে গেছে । সেদিন কে যেন বলল , স্যারের প্রমোশন হয়ে গেছে । কতটুকু সত্য সেটা যাচাই করা হয়নি তবুও পুরো শরীর মোঁচর দিয়ে ওঠলো । একটু খারাপ লাগলো , কোনদিন হয়তো দেখা হবে না । সময়ের স্রোতে আমরা আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবো । তিনি হয়তো উচ্চতার চরম শিখরে পৌঁছবেন । বকশীগঞ্জের মানুষ এই মানুষটাকে মিস করবে । হয়তো উনাদের চোখের কোণে পানিও আসবে হয়তো মনের অজান্তে দোয়া করবে , এই মানুষটা অনেক কাল বেঁচে থাকুক । ইচ্ছে অনিচ্ছায় মানুষটাকে মনে করবে , প্রচন্ড আবেগ , কিংবা শ্রদ্ধা আর বাস্তবতায় লোকমুখে বলবে , এই শহরে একজন আ.স.ম জামশেদ খোন্দকার এসেছিলেন ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here